লাঞ্চ বক্স

অরন্য আজকে লাঞ্চ বক্সটা খুলতেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় ।
বাটি ভর্তি শুধু পায়েস আর পায়েস । দুধের বিশ্রী গন্ধে চারপাশটা ম ম করছে ।
কিচ্ছুক্ষন পরেই আসামীর ফোন -
প্রথমবার রিং বাজতে বাজতেই কেটে যায় , পরের বার অরন্য ফোন ধরতেই -
** হ্যা গো!! স্বামী খেয়েছেন ?? মেনে আপকা ফোন কা ইনতেজার কারতে কারতে থাক গায়া লেকেন আপনি তো ফোন দিবেন না জানি তাই নিজেরই নিয়ম করে ফোন দিতে হয় । কোন একটা দিন যদি জিজ্ঞেস করতেন খাইছি কিনা , কোন একটা দিন যদি ফোন দিয়া বলতেন আমার খাওয়া হয়ে গেছে তুমি খেয়ে নাও । কেমন যেন আপনি ? কিই সমস্যা আপনার?
- তোমার কথার এই শ্রী কেন? মেজো পাশে আছে ? থাকলে ওরে ভাত দিয়া পাঠায়া দাও । খিদা লাগছে ।
** আমি কি আপনাকে অখাদ্যা দিছি নাকি? ভাব দেখান কেনো এত ? মায়ের হাত , হাত । আমার হাত হাত না? আমি পায়েস রান্না করছি দেখে খাওয়া যাবে না ?
(অরন্যর অনেক ব্যাপারই আছে যেটা নাজনীনের অজানা,অরন্য নিজের ব্যাপার গুলো কারো সামনে তুলে ধরতে ততটা পটু নয় আবার বলা যায় নিজেকে কারো সামনে তুলে ধরতে ওর অনিহাই বেশি ,দুধে যে অরন্যর এলার্জির নাজনীন এটাও বোধ হয় জানে না ,এইটা ভেবেই অরন্য বলে ) ।
- দুপুর বেলা শুধু এইগুলা খেলে পেট ভরবে?আর মিষ্টি জিনিস এত গুলা খাওয়া যায় নাকি?
** সবটা খেলে আপনার জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে ।
- সারপ্রাইজ ট্রাইজ লাগবে না আমার , তুমি তোমার পাশের টারে দিয়া ভাত পাঠাও তো । দেড় ঘন্টা লাঞ্চের আধা ঘনটা তোমার সাথে কথা বলে কাটালে ......
** ... সরি । আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি । বলেই ফোনটা কেটে দেয় নাজনীন ।
(দুই মিনিট পর অরন্য আবার ফোন দেয়, ফোন রিসিভ করার মানুষটা খাবার প্যাক করতে ব্যাস্ত।ফোন রিসিভ করে মেজোটা ।)
সোহান - ঐ তোর প্রবলেম কি? একবেলা পায়েস খাইলে মরে যাবি? বিষ তো না পায়সই তো ? আর এলার্জি তে মানুষ মরে না ।
- ফোনটা ওর কাছে দে।
> তুই আবার ফোন দে, আমি কাটলাম । দ্যান নিয়া দিতেছি ।
- ওকে ।
অরন্য আবার কল দেয় ।
> ভাবীইইই । ভাইয়া কখন থেকে ফোন দিতেছে আর তুমি এইখানে ... এই নাও ধরো ।
মেজোটার হাত থেকে নাজনীন ফোন নিয়ে -
** জ্বী বলেন ।
- সারপ্রাইজ টা কি বলা যাবে কি?
** কিছু না এমনিতেই বলা হইছে ।
- চামুচ খুজে পাচ্ছি না , তাই ফোন দিছিলাম । চামুচ কি দিছিলা নাকি চুমুক দিয়ে চুমুক দিয়ে খেতে হবে ।
** ঐসব খেতে হবে না আপনার , আমি আপনার খাবার পাঠাচ্ছি।
- নাজনীন ।
** আমি বলছি না , নাম ধরে ডাকবেন না আপনি  ।
- কাছে থাকলে আচল ধরে , চুড়ি ধরে , কানের দুল ধরে , চুল ধরে ডাক দিতাম , কাছে নাই এখন ডাকার ওয়ে তো একটাই, এ ছাড়া কেমনে ডাক দিবো বলো । 
** ঢং
- চামুচ
** দেই নাই । যেমনে পারেন খান গিয়া যান ।
অরন্য ফোন কেটে দেয় ।
নাজনীনের মেসেজ - চামুচ তাড়াহুড়োয় মনে ছিলো না বাটিতে দিতে , পরে আপনার ব্যাগ এ দিয়ে দিছি , ব্যাগ এর একবারে উপরের পকেট আছে না ঐটা তে দেখেন ।
অরন্য আবার ফোন দেয়।
-খেয়ে নাও । আমি খাচ্ছি । 
** আপনি ফোন ধরে রেখে খান , আমি শুনি 
- আচ্ছা ঠিক আছে ।
** 
(কিছুখন পর পাশ থেকে ক্ষীন একটা মেয়েলী কন্ঠ শুনতে পায় , বাহ আজ পায়েস । একা একাই খাবে নাকি , আজকে আমার কথা ভুলে গেলে নাকি ?
- আরে না , ভুলবো কেন। পায়েস !! তোর কেমন না কেমন লাগে তাই আর.. ।
> কে রান্না করেছে , আন্টি ??
- না আমিই করে নিয়া আসছি আমি তো মাস্টার সেইফ জানিস না! , (একটা বাটি অরন্য রিয়ার সামনে এগিয়ে দেয় ।)
রিয়া কথা শুনে আর পায়েস মুখে দিয়েই বাহ , ভালোই রান্না করতে পারো । কপালে যে জুটবে সে খুব লাকী হবে । তো কি গান শুনতেছো একটা এয়ার ফোন এইদিকে দাও।আর শোন স্যার বলছে আজকের মধ্যে থার্ড প্রজেক্টটা সাবমিট করতে। তুমি পারলে তিনটার দিকে পুরো কাজটা আমাকে দেখিয়ে নিয়ো একবার । )
ওপাশ থেকে নাজনীন সব শুনছে আর রাগে ফুলছে -
আনমনেই বলে বসে লাকী না ছাই ।
নাজনীন - এই যে সামনে যে বসে আছে তাকে ফোনটা দেন কথা বলবো আমি ।
নাজনীনের কথা অরন্য শুনছে কিন্তু উত্তর দিচ্ছে না ।
নাজনীন- ফোনটা দিবেন নাকি আমি ফোন কেটে দিবো?
অরন্য জানে মেয়েটা ভয়ানক অভিমানী , আর অভিমান টভিমান ভঙ্গানো অরন্যর সাথে ঠিক যায় না ।
অরন্য - কি বলবে! আমাকে বলো আমি বলে দিচ্ছি ।
রিয়া - কার সাথে গুজুর গুজুর ফুসুর করতেছো,ইয়ার ফোন কানে লাগায়া ? খাওয়ার সময় কথা বলতে হয় না।
নাজনীন - এই যে , বলেন বউর সাথে কথা বলনে। বলেন । নাইলে কালকেই আমি ...
অরন্য - রিয়া তোর ভাবীর সাথে কথা বলতেছি । তুই এইটা নিয়া তোর টেবিলে যা , আমি প্রজেক্ট এর ডীটেইলস নিয়ে একটু পর আসতেছি ।
রিয়া - ভালোই , বউ পেয়ে বোনকে এখন পর পর লাগে । (রিয়া চলে যায় । )
নাজনীন - খেদায়া দিলেন কেন? কথা বলতেন আর কতখন? আমার সাথে কথা বললেই তো শুধু কারো সময় নষ্ট হয় । আর দুনিয়ার সবার সাথে কথা বলার সময় থাকে মানুষের  । হাহ
অরন্য - আমার খাওয়া কিন্তু শেষ প্রায়। সারপ্রাইজটা কি?
(অরন্যর চোখ আর নাক চুলকাতে চুলকাতে অবস্থা প্রায় খারাপ । একটু পর পর কাশিও দিচ্ছে । )
নাজনীন - আমি না হিন্দি শিখতেছি ?
- ভালো তো ,আপনার হিন্দীর শ্রী দেখেই বুঝছি কে শিখাইতেছে আপনারে , ঘরে আতেল আরেকটা বাড়তেছে । তো আপনার গুরুজী কত ফী নিতেছে?
** আপনার একটা ছবি হোয়াটস এপ করেন না । চোখ দুইটা যাতে ভালো মত বুঝা যায় ।
- কিহ?
** গুরুজী আমারে হোয়াটস এপও খুলে দিছে  ।
- আপনার গুরুজীরে বইলেন আমি আজকে বাসায় আসলে ফী এর সাথে চপ্পল ও পাবে দুইটা ।
** অনেক কষ্টে গান এর লাইন গুলা মনে রাখছি , শুনবেন কি আপনি? আমার কিন্তু ভুলে যাবো যাবো অবস্থা ।
- জ্বী শুনান ।
অরন্য পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে , মোবাইল লাউডে দিয়ে ছোট মোবাইলটাতে রেকর্ডিং অপশন চালু করে দেয় । আফসোস কথা বলার শুরু করার আগে কলটা রেকর্ড করা উচিত ছিলো অরন্য ভাবে ।
** চোরি চোরি দিল তেরা চুরায়ঙ্গে ,
আপনা তুজে হাম বানায়াঙ্গে ।
ধীরে পাস তেরে আয়েঙ্গে
আকে দূর ফের না যায়ঙ্গে
(অরন্য অনেক কষ্টে সাইলেন্টলি হাসতে থাকে । এমন পাগলীও যদি কারো কপালে জোটে , তার জীবন ভালোবাসা পেতে পেতেই তেজপাতা হয়ে যাবে । 😂😂😂 )
** শুনতেছিন কি আপনি?
- হ্যা হ্যা , তুমি গাইতে থাকো , আমি শুনতেছি । 😂😂😂😂😂😂😂
** তু মেরী মাথে কি বিন্দিয়া
তু নেয়নো কা কাজল হে ।
মে বারখা তু বাদল হে ।
(এই যে আপনি আবার হাসতেছেন না তো ?)
- না না । তুমি গাও , অস্থির লাগতেছে শুনতে । 😂😂😂
** মে তেরী বাহমে সাজান
সারি ওমার গুজারুঙ্গি
বাস তুজকোহি চাহুঙ্গি ।
(গান শেষ , কেমন লাগছে আপনার কাছে, বলতে হবে না । যেমনই লাগুক না কেন শুধু না হাসলেই হইলো । আর শুনেন আপনার মানি ব্যাগে আম্মুর ছবি নিচে আপনার এলার্জির একটা ট্যাবলেট রাখা আছে । )
অরন্য মানি ব্যাগ খুলতেই দেখে , মায়ের ছবির পাশে ছোট্ট করে একটা ছবিও রাখা আছে নাজনীনের , দুইটা ছবির নিচেই ট্যাবলেট টা।
-হ্যালো
** হুম বলেন , পাইছেন ঔষুধ?
- আমার এলার্জি এইটা তুমি জানো !! মানি ব্যাগ এ পিক!! ঔষুধ !! আবার সাথে গান । সারপ্রাইজ তো একটা দেয়ার কথা ছিলো । এক সাথে এত্ত গুলা সারপ্রাইজ দিলে সেইগুলা শকে এ পরিণত হয় জানো ?
** আপনি যেই পরিমাণ শক খাইছেন , প্রতি রাতে তার থেকেও বেশি শক খাই । আমার মাথার নিচের বালিশ ইচ্ছা করেই নিচে ফেলে রাখি আপনি ভাবেন তাই না?আসলে আমার ছোট বেলা থেকেই ..................... । দুই দিন উঠায়াও দিছেন , টের পেয়েছিলাম । পরে বিরক্ত হয়ে গেছেন বোধ হয় ।ইদানিং প্রতিদিন সকাল বেলা উঠে দেখি আপনার বুকে আমার মাথা , আর আপনি নাক ডেক ঘুমোচ্ছেন । কিছু মেলাতে পারছিলাম না , বালিশে শোয়ার অভ্যাস নেই আমার ।আর আপনার বুকে নিজ থেকে যাবো প্রশ্নই আসে না । পরে একদিন ইচ্ছা করেই বালিশ নিচে ফেলে ঘুমের ভান ধরে পরে আছি । ফীল করলাম আপনি জেগে গেছেন । আমা্র দিকে খেয়াল করে মাথাটার নিচে হাত দিয়ে নিজের বুকে নিলেন দ্যান আবার ঘুম , এক রাতে চার বার আমার মাথা বুকে নিছেন । এইগুলা শক না? প্রায়ই জেগে থাকা হয় আপনার এই পাগলামি ফীল করার জন্যে স্যার। আর শুনেন ঐ মেয়ের কাছ থেকে দূরে থাকবেন । নেক্সট টাইম আমি কল দিলে আপনার আশে পাশে যাতে কোন মেয়ের ভয়েস না শুনি । অসহ্য লাগে ।
- বিশ্বাস টা একবার ছুয়ে দেখো ,
তাহলেই বুঝবে কতটা তোমার আছি । 
** হইছে এত সুন্দর করে সুন্দর সুন্দর কথা বলতে হবে না । এই জন্যেই তো মেয়ে গুলা ...... । একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
- করো ?
** মাথাটা প্রতি রাতে বুকে টেনে নেন কেনো ?উপরে উপরে দেখান তো কতটা অসহ্য আমি আপনার কাছে !!
- মেঘ ছোঁয়ার অভিলাষ কার না থাকে , আর সবার কপালে তো তোমার মত মেঘবতী জোটে না , মেঘবতীর মেঘ কালো চুল গুলো বুকের উপর ছড়িয়ে থাকলে বুকটাকে আকাশ আকাশ লাগে । 
** আপনি তো দেখছি আমার মুখ দিয়ে ভালোবাসি বের করিয়েই ছাড়বেন । সেকেন্ড কোন মেঘ যাতে আকাশে ঠাই না পায় হুম । মেঘে মেঘে সংঘর্ষ হলে কিন্তু আকাশটা পুড়ে ......... 
- খেয়ে নাও পাগলীটা না খাইলে ঝাড়ি দেয়ার এনার্জি পাবা কোত্থেকে  ? বলেই অরন্য ফোনটা কেটে দেয় ।













0 comments:

Post a Comment